সময়টা আজ থেকে ৫০ বছর আগে, সকালের নাস্তা করতে বসেছে সিকিমের রাজ পরিবার।ঠিক সেসময় বেরসিক ভাবে উপস্থিত হন ভারতীয় সেনাবাহিনী। রাজ প্রাসাদের কৰ্মকর্তা ও কর্মচারীদের বন্দী করে ভারতীয় সৈন্যরা পুরো সিকিমের দখল নিয়ন্ত্রন নিয়ে ফেললেন। সিকিম হয়ে গেল ভারতের ২২ তম অঙ্গরাজ্য। স্বাধীন দেশ থেকে সিকিম হয়ে গেল একটি রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য। অথ্যাৎ তাদের ভাগ্যে জুটলো ডিমোশন।সিকিম ভারতের বর্তমানে ২য় ক্ষুদ্রতম অঙ্গরাজ্য।
আমাদের দেশের রাজনৈতিবাদদের মুখে আগে শুনতাম বাংলাদেশকে ভূটান কিংবা সিকিম হতে দিব না। ভূটান একটা স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু সিকিমের এমন কী ঘটেছিল যে তারা ভারতের পেটে ঢুকে গেল। কোন রকম সামরিক অভিযান বা কোন রকম বাধা ছাড়াই সিকিম হয়ে গেল ভারতের অংশ। যেন তিমি মাছ মুখ হা করে বসেছিল আর ছোট মাছটি টোপ করে তার পেটে ঢুকে গেল। এই ছোট মাছটি শিকার করতে ভারতকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। ভারতের শিকারে পরিণত হওয়ার জন্য একটি বিশেষ চরিত্র নাম আসবে তার নাম কাজী লেন্দুপ দর্জি।তার আগে সিকিমের পূর্বের ইতিহাস জানা দরকার।
সিকিম ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নামগ্যাল রাজবংশের রাজারা (চোগিয়াল নামে পরিচিত) শাসন করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে সিকিম এক ধরনের প্রোটেক্টরেট বা রক্ষাকবচ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল।
১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের সময় সিকিম ভারতের সাথে যোগ দেয় নি। কিন্ত তারা ভূল করে বসলো ১৯৫০ সালে এসে।
১৯৫০ সালে সিকিম ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, সিকিম তার অভ্যন্তরীণ শাসন বজায় রাখলেও প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দায়িত্ব ভারতের হাতে চলে যায়। মূলত এভাবেই সিকিম ভারতের আধা-নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থায় পৌঁছে যায়। অথ্যাৎ একটি রাষ্ট্রের প্রায় সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করবে করেকটি রাষ্ট্র। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মতো মন্ত্রনালয় যদি আরেকটি দেশ নিয়ন্ত্রন করে তবে সেদেশ এক প্রকার নিজেকে অন্যের হাতে সপে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। মূলত সিকিমের রাজাদের ভূল সিদান্তের ফল আজও ভোগ করতেছে সিকিমবাসী। শাসক হিসাবেও এই রাজারা খুব ভাল ছিল না। বর্তমানে সিকিমের জনসংখ্যা মাত্র ৬ লাখের বেশী,৭৫ এর পূর্বে জনসখ্যা ছিল মাত্র ২ লাখের বেশী। এত অল্প সংখ্যক জনসংখ্যার দেশ হওয়া স্বত্বেও সিকিমের রাজারা নিজেদের ভোগ বিলাসে বেশী ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। তাই জনগনের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯৭০ এর দশকে সিকিমে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। রাজা চোগিয়ালের একাধিপত্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়। মূলত সিকিমের রাজারাই নিজেরাই এর জন্য দায়ী ছিল। জনগণ সম্পূর্ণ সিকিমের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে চলে গেল। তারা রাজতন্ত্রের বিপরীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এ জড়িয়ে পড়লো। আর এই আদোলন নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন নেতার প্রযোজন। আর এই নেতার নাম ছিল কাজী লেন্দুপ দর্জি। মূলত ভারতের পৃষ্ঠপোষকে লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়। প্রায় প্রতদিনই রাজপথে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মিছিল মিটিং হতো। আবার ভারতীয় সৈন্যরাও সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে এই আন্দোলন আরো উসকে দিতো। বলতে গেলে সিকিমের তখন হযবরল অবস্হা। রাজারা না পারতেছে মানুষের মন জয় করতে না পারতেছে আন্দোলন দমন করতে। সিকিমের জন বিন্যাসেও কিছুটা বিচিত্রতা আছে।সিকিমের অধিবাসীদের মধ্যে নেপাল থেকে আসা নেপালি (গোর্খারা) প্রায় ৬০– ৭০ %, তিব্বত থেকে আসা ভূটিয়ারা প্রায় ১৫-২০% আর মূল সিকিমবাসী যারা লেপচা নামে পরিচিত তারা মাত্র প্রায় ১০–১৫%। অর্থ্যাৎ নেপালীরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আর এই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মূল আন্দোলনে নেপালীরা নেতৃত্ব দিত। দেশ চালাতে অক্ষম রাজাদেরকে বিরুদ্ধে গিয়ে সিকিমের বহু মানুষ ভারতের সঙ্গে একীভূত হওয়ার দাবি তুলতে থাকে। বিভিন্ন ঘটনা প্রতি ঘটনার ভিতর আসে ১৯৭৫ সাল। আসলে ৭৫ সাল যেন দেশ বিদেশের রাজনীতিতে যেন উক্তাল বছর।১৯৭৫ সালে ভারতের সহায়তায় সিকিমে এক বিতর্কিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে বিতর্কিত সেই গণভোটে অধিকাংশ মানুষ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দেয়।একটা দেশের অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত গণভোট নিয়ন্ত্রণ করলো অরেকটা দেশের সেনাবাহিনী। সুতরাং বুঝাই যায় সিকিমের রাজারা কত দূর্বল ছিল। গনভোটের পর ভারতীয় সেনাবাহিনী সিকিমে সম্পূর্ণরুপে প্রবেশ করে এবং রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। একই বছরের মে মাসে ভারতের সংসদে একটি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সিকিমকে ভারতের ২২তম রাজ্য ঘোষণা করা হয়।আর এভাবেই সিকিমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। সিকিম হচ্ছে নেপাল ও ভুটানের মাঝে অবস্থিত। কৌশলগত দিক দিয়ে সিকিম ভারতের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সিকিমের উপড়েই তিব্বত অবস্থিত। ভারত কৌশলগতভাবে চীন সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।তাই সিকিম দখল ভারতের জন্য বেশ জরুরী ছিল। আর সিকিমের এই পরাধীনতার পিছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশী তিনি হচ্ছেন লেন্দুপ দর্জি। মানুষ স্বাধীনতার জন্য অবদান রাখেন। আর বিশ্ব ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যে নিজের দেশকে আরেক দেশের হাতে তুলে দিয়েছেন। তার এই অবদানের জন্য হয়েছিলেন সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী।৭৫ থেকে ৭৯ সাল পর্যন্ত সিকিমের ১ম মূখ্যমন্ত্রী।তার শেষ জীবনটা সুখকর হয় নি। সিকিমের মানুষ তাকে একজন দেশদ্রৌহি ভাবতে থাকেন।ভারত অবশ্য তাকে পুরস্কার স্বরুপ পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রদান করে। শেষ বয়সে এসে অনেকটা নির্বাসিতভাবে ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যবরণ করে।আর এভাবেই শেষ হয় একজন বিতর্কিত ব্যক্তির জীবনাসন।
|
লেখার শুরুতে 'কাঞ্চনজঙ্ঘার' ছবি দিয়েছি। যা সিকিমে অবস্থিত। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পর্বতশৃঙ্গ 'কাঞ্চনজঙ্ঘা'। শীতকালে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা হতে স্পষ্টভাবে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। বাংলাদেশের তিস্তা নদীর উৎসও কিন্ত সিকিমে। ও আরেকজনের নাম বাদ যাচ্ছে তিনি হচ্ছেন ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া। তিনি সিকিমের অধিবাসী।দক্ষিণ এশিয়ার সবচেযে সেরা ফুটবলার হিসাবে উনার নাম সবার আগে আসবে।
| শীতকালে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য। |
লেখার শুরুতে 'কাঞ্চনজঙ্ঘার' ছবি দিয়েছি। যা সিকিমে অবস্থিত। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পর্বতশৃঙ্গ 'কাঞ্চনজঙ্ঘা'। শীতকালে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা হতে স্পষ্টভাবে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। বাংলাদেশের তিস্তা নদীর উৎসও কিন্ত সিকিমে। ও আরেকজনের নাম বাদ যাচ্ছে তিনি হচ্ছেন ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া। তিনি সিকিমের অধিবাসী।দক্ষিণ এশিয়ার সবচেযে সেরা ফুটবলার হিসাবে উনার নাম সবার আগে আসবে।
সিকিম আয়তনে ছোট হলেও (৭০৯৬ বর্গ কিঃ মিঃ যা রংপুর জেলার সমান), প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্যা। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন সিকিম ভ্রমণ করতে।তাই ভারত সিকিমকে নিজেদের করে নিযে ভূল করে নি। তারা অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ভাবে বেশ লাভবান হয়েছে।
লেখক: রম্য রহিম।
Comments
Post a Comment