মাসুম সাহেব একজন সহজ সরল মানুষ। অনেকটা আমার মতন😆। কারও সাথেও নেই পাঁচেও নেই। নিজের কাজটা দক্ষতার সহিত করেন।কোন কাজে তার না নাই। শুধু নিজের কাজ না অন্য কলিগদের সব ধরনের কাজে সহযোগিতা করেন। বলতে গেলে কাজ পাগল একজন মানুুষ। অন্যরা যেখানে কাজ ফাকি দেয় সেদিক থেকে মাসুম সাহেব ঢেড় অনেক ভাল। এই ভাল মানুষটা আজ প্রায় ৭ বছর যাবৎ একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে এইচ আর বিভাগে মধ্যম সারির কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।
আজ সকাল থেকে মাসুম সাহেব উক্তেজিত মনে কাজ করতেছেন।কেননা আজ বার্ষিক প্রমোশন, ইক্রিমেন্ট ইত্যাদি ঘোষিত হবে।এই অফিসে প্রায় ৭ বছর যাবৎ আছেন। কিন্ত কোন প্রমোশন হয় নি। তার সামনে দিয়ে জুনিয়র সহকর্মীরা প্রমোশন পেযে কেউ কেউ বস লেভেলে চলে গেছেন। আর মাসুম সাহেব সেই মাসুম সাহেবই রয়ে গেছেন। এবারের প্রমোশনটা বেশি দরকার তার। কেননা দিনেকে দিন সংসারের খরচও বাড়তেছে।বড় মেয়েটা এবার ইন্টার পাস করেছ। আর ছোট ছেলেটে বিজ্ঞান বিভাগে নাইনে পড়তেছে। পড়াশোনার খরচ বেড়ে গেছে। সেই সাথে বাসাটাও পরিবর্তন করতে হবে। ছেলে মেয়েরা বড় হচ্ছে তাদের জন্যও আলাদ রুম লাগবে। সব কিছু মিলিয়ে তার এবারের প্রমোশনটা খুব দরকার, সারাদিন উক্তেজিত মনে অপেক্ষা করতেছেন কখন বিকাল হবে, মূলত শেষ বিকালের দিকে যারা প্রমোশন পাবেন তাদের কাছে mail চলে আসে।
বিকাল হতেই তার মনে চাপা উক্তেজনা বিরাজ করতেছে। একটু পর পর mail চেক করতেছেন কখন 🥲প্রমোশনের mail আসে। অপেক্ষা করতে করতে শেষ বিকাল প্রায় শেষ হতে চললো কিন্তু প্রমোশনের mail আর আসে না। হঠ্যাৎ করে পাশের ডেস্কে মঞ্জুর সাহেব উক্তেজিত কন্ঠে got it, got it বলে চিল্লিয়ে উঠলো, অর্থ্যাৎ তিনি প্রমোশন পেয়েছেন, মঞ্জুর সাহেব অফিসে join করেছেন ২বছর মাত্র, বলতে গেলে আসতে না আসতেই প্রমোশন পেয়ে গেলেন।
মঞ্জুর সাহেবের কাছে প্রমোশনের মেইল আসার পর মাসুম সাহেবের উক্তেজনা যেন আরও বেড়ে গেল। তার সমস্ত মনোযোগ mail এর উপড়, একটু পর পর mail এ Refresh দিচ্ছেন। আবার Junk mail চেক করতেছেন। সমস্ত পৃথিবী যেন mail ভিতর আটকে গেছে। একটা সময় তার উপলব্দি হল তিনি এবারও প্রমোশন পান নি। তার সময়টা যেন থমকে গেছে। কিছুক্ষণ পর পিয়ন এসে বলে গেলেন যারা প্রমোশন পেযেছেন সবাই বড় Sir এর রুমে গেছেন দেখা করতে। মাসুম সাহেব চশমা খুলে রাজ্যের হতাশা নিয়ে চুপ করে বসে রইলেন।
উপড়ের ঘটনায় মাসুম সাহেব কী অফিস পলিটিক্সের শিকার নাকি অযোগ্যতার অভাব। আসলে তিনি অফিস পলিটিক্সের শিকার। মূলত মাসুম সাহেব একজন দক্ষ কর্মী হওয়ার পরও শুধুমাত্র বসদের সাথে ভাল সর্ম্পক না থাকার কারণে বসদের গুডবুকে নিজেকে স্থান দিতে পারেন নি। কর্পোরেট জগতে কেউ কারো বন্ধু হতে পারে না। উপড় দিয়ে সবাই নিজের ভাল রুপটা দেখায় কিন্তু তাদের সবার ভিতরের যে কৃৎসিত রুপটা আছে তা কেউ দেখতে পায় না।কে কাকে ডিঙ্গিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে সেই চেষ্টাতেই সবাই ব্যাস্ত। অফিসের বসকে কে কত বেশী তেল মেরে এগিয়ে বসের হৃদয়ে স্থান নিবে সেই চেষ্টাতে ব্যাস্ত সবাই। বসদের সামনে নিজেকে হাই লাইট করার জন্য অন্য সহকর্মীদের কৌশলে ছোট করা, আবার সহকর্মীদের ছোট খাট ভূল বসদের কাছে অচিরঞ্জিতভাবে বাড়িয়ে বলা। আবার নিজের ভূল সুকৌশলে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া, ইত্যাদি অফিস পলিটিক্সেরই একটা অংশ। অফিসের বাইরেও বসদের ছোট খাট কাজ করে দেওয়া। Off day তে বসদের বাসায় গিয়ে বসদের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করা। বসদের বাচ্চাদের জন্য Gift কিনে দেওয়া। আরো অনেক কিছু আছে যা অফিস পলিটিক্সের অংশ। কে বসের কাছে প্রিয় হবে এসব নিয়েই কর্পোরেট পলিটিক্স তৈরি হয়। অনেক সময় কাজের দক্ষতার চেয়ে সম্পর্ক বা প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায় এখানে। মানুষ তার পরিবারের থেকেও অফিসে সময় বেশী সময় দেয়। জীবনের একটা অংশ অফিসই চলে যায়। প্রতিদিন যাদের সাথে উঠতে বসতে দেখা সেই পরিচিত মুখ গুলোর মধ্যেই কেউ না কেউ আপনার বিরুদ্ধে বসের কাছে পিন লাগচ্ছেন কিনা তা আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন না। আবার বসদের ভিতরেও অনেকে আছে কলিগদের ভিতর নিজেই দ্বন্দ্ব লাগিয়ে চুপে চুপে মজাঁ উপভোগ করেন।কর্পোরেট পলিটিক্সের কারণে অনেক সময় অফিসে হিংসা, অবিশ্বাস আর অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। মেধাবী কর্মীরা অবহেলিত হন, আর এতে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়। একজন দক্ষ কর্মী তার দক্ষতার মূল্যায়িত না হলে এটার প্রভাব তার সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও এসে পড়ে। পরিবারের মানুষদের কাছেও গুরুত্ব কমতে থাকে।
এতক্ষণতো শুধু কর্পোরেট পলিটিক্স নিয়েই কথা বললাম। এর বাইরেও আছে হোম পলিটিক্স। যা আরও জটিল। ঘড়ের আপনজনরা যখন পরস্পরের ভিতর হোম পলিটিক্স এ জড়িয়ে পড়ে তখন পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। সাধারণত সম্পক্তি ভাগ বাটোয়ারীর হোম পলিটিক্স শুরু হয়। মাহিলাদের ক্ষেত্রে সদ্য বিয়ে করা নববধূ শ্বশ্বড় বাড়ির লোকদের কাছে হোম পলিটিক্সের শিকার হতে হয়। দেখা যায় সারাদিন ঘড়ের সমস্ত কাজ ও রান্না বান্না করার পরেও এর ক্রেডিট অন্য সদস্যরা নেয়। রাতে খাওয়ার টেবিলে ছেলে বা কর্তা ব্যক্তির সামনে রান্নার ক্রেডিট নিজেরা নেয়, নতুন বউ যেন কিছুই করে নি। এতে সেই মেয়েটি সংসার জীবনে প্রথমেই পলিটিক্সের শিকার হতে হয়, এক সময় সেও এসব পলিটিক্স শিখে যায়। বিদেশ থেকে যে ভাইটি দেশের বাইরে থেকে কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠায়। তাকেও দেশে আসার পর বিভিন্ন ধরনের হোম বা ভিলেজ পলিটিক্সের শিকার হতে হয়।
ভিলেজ পলিটিক্সের যখন নাম চলে আসলো এই সমন্ধে কিছু বলা উচিত। ভিলেজ পলিটিক্স হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন পলিটিক্স। এর সমন্ধে কিছু লেখার সাহস আমার নাই। স্বয়ং ট্রাম্প - পুতিন যদি আসে তারাও ফেল করবে।
Politics শব্দের উৎপত্তি (Etymology)শব্দটি এসেছে Greek (গ্রিক) শব্দ politikos থেকে, যার অর্থ হলো “of, for, or relating to citizens” = নাগরিক সম্পর্কিত।গ্রিক polis মানে হলো শহর-রাষ্ট্র বা নগর।
আমরা Politics বলতে বুঝি ক্ষমতার ময়দানে এদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার জন্য কাঁড়াকাড়ি।কিন্তু আদৌতে পলিটিক্স শব্দটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রাত্যহিক অংশ হয়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর সব সময় সর্তক থাকতে হয় আপনি কি নতুন কোন পলিটিক্সের শিকার হতে চলেছেন নাকি শিকারী হতে চলেছি
শিকার নাকি শিকারি হবেন ডিশিসনটা আপনার উপড়। আপনার ডিসিশনের উপড় নির্ভর করতেছে আপনার ভাগ্য মাসুম সাহেব মতো হবে নাকি মঞ্জুর সাহেবের মতন হবে।
বিঃ দ্রঃ- সব চরিত্র কাল্পনিক।
লেখক: রম্য রহিম।
Nice
ReplyDelete